Travelogue

পাঁচ গুহার দেশ পাঁচমাড়ি

শ্রীপর্ণা মিত্র

  • এলাহাবাদ থেকে জব্বলপুরের দিকে যেতে একটা ছোট্ট রেলস্টেশন পড়ে। পিপরিয়া। এই পিপরিয়া থেকে ৫১ কিমি দূরে পাঁচ গুহার দেশ পাঁচমাধি, যা মুখে মুখে নাম নিয়েছে পাঁচমাড়ি। মধ্যপ্রদেশে সাতপুরা পর্বের অধিত্যকায় একটা ছোট্ট হিল স্টেশন।

    পিপরিয়া যখন পৌঁছলাম তখন দিওয়ালির ছুটি চলছে। অজস্র মানুষের ভিড়। ছুটি পেলেই কলকাতার লোকজন যেমন ভিড় জমান দার্জিলিঙে, মুম্বই-এর লোকজন মহাবলেশ্বরে, ভোপালের লোকজন ঠিক তেমনই পাঁচমাড়িতে। হোটেলে জায়গা মেলা দুষ্কর।

    একটা ধাবায় দুপুরের খাওয়া সেরে বাসে রওনা দিলাম পাঁচমাড়ির উদ্দেশে। সামনে পেছনে অজস্র গাড়ির লাইন। ধাবায় খাওয়ার সময়েই চোখ গিয়েছিল একটা বেশ হইহুল্লোড়ে মজাদার পরিবারের দিকে। এখন দেখি তাঁদের গাড়িটাও বেশ মজার। সাদা রঙের গাড়িতে রঙিন মার্কার পেন দিয়ে ওই পরিবারের নানা জন লিখে রেখেছেন দিওয়ালিতে কে কী ড্রেস পরেছেন, কে কী উপহার পেয়েছেন, কে ক’টা বাজি ফাটিয়েছেন, কে ক’টা লাড্ডু খেয়েছেন ইত্যাদি। তার নিচে সেই সদস্যের সই।

    খাওয়াদাওয়ার পর বাসে উঠলে বেশ ঘুমঘুম পায়। কিন্তু সেসব কাটিয়ে পথের আনন্দকে দ্বিগুণ করে দিল সবুজে ঢাকা পাহাড় আর মাঝে মাঝে দৃশ্যমান হরিণেরা। বিকেলের পড়ন্ত রোদে বাস থেকে নামার সময় জানতামও না কতখানি বিস্ময় আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে।

    আমাদের হোটেলটা বাসস্ট্যান্ডের কাছেই। রাস্তার দু’ধারে কিছু দোকানপাট। সবই শীতবস্ত্র, হস্তশিল্প, কাঠের খেলনা ও গরম জামাকাপড়ের। আর আছে ছাতার নিচে টেবিল-চেয়ার পেতে ছোট ছোট কফিশপ। বরাবরই লক্ষ করেছি এইধরনের ছোট পাহাড়ি জনপদে ভাল হোটেল মেলা দুষ্কর। ঘরগুলো কেমন স্যাঁতস্যাঁতে। দেওয়ালে লাগানো ওয়ালপেপারগুলো পুরনো হয়ে যাওয়ায় একটা ভ্যাপসানি গন্ধ বেরোচ্ছে। বাথরুমও মনের মতো নয়। তবে বারান্দায় বেরোতেই মনটা ভাল হয়ে গেল। যতদূর তাকাই শুধু সবুজে ঢাকা পাহাড়। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে গেছে কালো ফিতের মতো রাস্তা। একটা টিনের চালে বাঁদরেরা লাফালাফি করছে। পরিবেশটায় কেমন যেন একটা নেশা ধরানো ভাব। ঠান্ডাটা সহ্যের মধ্যে।

    সন্ধ্যেবেলা পায়ে হেঁটে বাজার এলাকাটা ঘুরতে বেরিয়ে দেখলাম, বেশ জনসমাগম হয়েছে। অত মানুষের জায়গা নেই। যাঁরা হোটেলে জায়গা পাননি তাঁরা নিজেদের গাড়িতেই রাত কাটাবার বন্দোবস্ত করছেন। রাতে যে জাঁকিয়ে শীত পড়বে সেটা বেড়াতে বেড়াতেই অনুভব করছিলাম। পাঁচমাড়িতে মাছ পাওয়া যায়না। মাংস অথবা নিরামিষ, অপশন এই দুটো। রাতে রুটি মাংস খেয়ে, ছাদে ক্যাম্প ফায়ার করে ঘুমোতে যেতে বেশ দেরিই হয়ে গেল।

    পরদিন সকালে এম পি টি ডি সি-র জিপে চললাম বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র দু’ কিমি দূরে, শ’খানেক ফুট নিচুতে জটাশঙ্কর গুহা। বেশ দুর্গম রাস্তা। সিঁড়ির ধাপ-টাপ কিছু নেই। পাহাড়ের বড় বড় পাথর বেয়ে মানুষ নামে, পায়ে পায়ে সেটাই চলার রাস্তা হয়ে গেছে। নিচে নেমে মাথা নিচু করে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে পৌঁছলাম জটাশঙ্করের মূর্তির সামনে। মূর্তিটি আসলে স্ট্যালাগমাইট, তা জটার রূপ নিয়েছে। তাতে অজস্র বেণীর প্যাঁচ। গুহার মাথা থেকে জলের ধারা নদীর রূপ নিয়েছে। গোড়ালি ভেজানো জলের ওপর দাঁড়িয়ে জটাশঙ্কর দর্শন হল। প্রকৃতির গহ্বরে লুকিয়ে থাকা এই বিস্ময় সত্যি অনবদ্য।

    এর পরের গন্তব্য সরকারি উদ্যানের বিপরীতে পাঁচগুহা বা পান্ডবা কেভ। অজ্ঞাতবাসের সময়ে পাণ্ডবরা নাকি এখানে লুকিয়ে ছিল। পণ্ডিতেরা বলেন, এগুলি জৈন বা বৌদ্ধ গুহা। গুহায় বৌদ্ধ বিহারধর্মী আর্টের সন্ধানও মিলল। মন ভরিয়ে দিল গুহার ওপর থেকে দৃশ্যমান নৈসর্গিক দৃশ্য।

    এখান থেকে ১২ কিমি দূরে মহাদেব পাহাড়ে আছে মহাদেব গুহা। দুটো গুহা, বড় আর ছোট। আরণ্যক পরিবেশ। পাহাড়ি ঝরনার জলে লোকজন স্নান করছেন। গুহার অন্দরে আছে প্রায় ১০,০০০ বছরের পুরনো মেসোলিথিক যুগের সমাজচিত্র। এখান থেকে ডানদিকের সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছে যাওয়া যায় পার্বতী গুহায়।

    বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম গুপ্তমহেশ্বরে পৌঁছে। একই পাহাড়ের মাঝে ফাটল। ঘোর অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে, মোমবাতির আলোয়, কোনও রকমে গা বাঁচিয়ে হেঁটে এসে পৌঁছলাম গুহার অন্দরে। অনবদ্য অভিজ্ঞতা। ভেতরের পরিবেশ যে-কোনও হিন্দু মন্দিরের মতো। সাদা পাথরের শিবলিঙ্গ, নাম গুপ্তমহেশ্বর। ফুল, চন্দন, ধূপকাঠি দেখে বুঝলাম নিত্য পূজা হয়। মোমবাতিটা রেখে ফিরে এলাম। আমার পরের যাত্রী আবার ঢুকলেন একই ভাবে মোমবাতি হাতে। যেতে আসতে পাথরের ঘষটানিতে হাত পা সামান্য ছড়ে গেল। কেউ মজা করে বলছিলেন, এ গুহায় বিনা বাধায় প্রবেশ করতে সাইজ জিরো হওয়া আবশ্যিক। আর-এক প্রবীণ সহযাত্রী রসিকতা করলেন,  পাঁচমাড়িতে দেখছি পাণ্ডব থেকে মহাদেব সবাই লুকিয়ে থাকতেই আসতেন! বড় ও ছোট মহাদেব গুহা ছাড়া বাকি সব গুহাতেই বিনা বাধায় ফটোগ্রাফি করা যায়।

    বিকেলে গেলাম শহর থেকে ১৩ কিমি দূরে হান্ডি খো। ৩০০ ফুট গভীর খাদ। পুরাকালে হ্রদ ছিল, পরে যা শুকিয়ে গিয়ে হাঁড়ির আকার ধারণ করেছে। তাই এর নাম হান্ডি খো। এলাকাবাসীদের মতে, এর জন্ম মহাদেবের রোষানলে। ভূতাত্ত্বিকরা অবশ্য দায়ী করেন ভূমিকম্পকে।

    ধূপগড় থেকে সূর্যাস্ত নাকি মনোরম দৃশ্য। ১১০০ ফুট চড়াই উঠে গেল এম পি টি ডি সি-র জিপ। আমরা এখন সাতপুরা পর্বতের চূড়ায়। চারদিকে অপূর্ব নিসর্গ। আশেপাশে বহু বিদেশি পর্যটকের ভিড়। ডুবন্ত সূর্যকে ক্যামেরাবন্দি করবে বলে সবাই অপেক্ষমাণ। আকাশ রাঙা হচ্ছে।

You may like