Travelogue

ঘুরতে ঘুরতে মুরগুমা

দীপক দাস

  • ‘তুমি ত মোড়ল আছ! তুমি গিয়া দিখাই দাও না কেনে?’ বাল্‌বের হলুদ ঘোলাটে আলোয় তরুণের ক্ষিপ্ত মুখটা ঠিক দেখা গেল না। তবে ঝাঁঝালো কণ্ঠে মালুম হল, তিনি চটেছেন।

    সপ্তমীর রাত। আমরা তিন তরুণ গোটা চারেক জেলা উজিয়ে হাজির মুরগুমার মোড়ে। চলছে রাতের আশ্রয় খোঁজার পালা। তাতেই গোলের শুরু। মুরগুমা আসার কথা ছিল অষ্টমীর দিন সকালে। কিন্তু আমাদের প্রথম অভিযানটি স্টেশনেই মারা পড়িয়াছে। ভূতুড়ে স্টেশন বলে কুখ্যাত বেগুনকোদরে কোনও ভূত নেই! তাই... 

    ঝালদা থেকে বেগুনকোদর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত টেম্পো চলে। অনেক চেষ্টায় একটার দেখা মিলল। চালক গাড়িতে মুদিখানার মাল গাদা করছেন। মালপত্রের ফাঁকফোকরে পা ঢুকিয়ে আমি আর শুভ সিঁটিয়ে বসে রইলাম। ইন্দ্র চালকের পাশে। টেম্পোয় ব্যাপক ভিড়। বড় বড় ঝোড়াঝুড়ি নিয়ে বেশ কয়েকজন আদিবাসী মহিলা-পুরুষ উঠেছেন।

    বেগুনকোদরে টেম্পো খালি। আমরাও চিন্তামুক্ত। চালক রাজি হওয়ায় ফাঁকা টেম্পোয় শুরু মুরগুমা গমন। সে এক অন্য অনুভূতি। যুগপত্‌ শরীরে এবং মনে। রাস্তা খুব খারাপ। টেম্পো একবার ডানদিকে কাত হচ্ছে পরক্ষণেই সামলে নিয়ে পড়ছে বাঁদিকের গর্তে। একটু ঠিকঠাক চললে প্রকৃতির দিকে মুখ ফেরাতে পারছি। জঙ্গুলে পথ। অন্ধকারটা জমাট। টেম্পোর আলো অন্ধকার পাতলা করে এগিয়ে চলেছে। কানে আসছে পোকাদের একটানা গণসংগীত। একটা ঝাঁকড়া গাছ ছেয়ে আছে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি। মনে হচ্ছিল, কোনও আদিম প্রকৃতিতে এসে পড়েছি। 

    তারপর সেই ঘোলাটে আলোর মোড়। সিমেন্ট বাঁধানো চাতালে গ্রামবাসীদের আড্ডা। সাহায্য প্রার্থনা করতেই প্রায় গোটা পাড়া এগিয়ে এল। বৃদ্ধ বললেন: ‘কার বাড়ি যেতে চায় দিখাই দাও।’ তরুণের কণ্ঠে তারই ঝাঁঝালো উত্তর, ‘তুমি ত মোড়ল আছ...'

    টেম্পোচালকের কথাতেই এক হোম স্টে-র মালিকের সন্ধান মিলল। তিনি ফোনে জানালেন, কোনও এক দুর্গামন্দিরের সামনে যেতে। কিন্তু দুর্গামন্দিরটা কোথায় রে বাবা! আবার সেই উপদেশ, ‘ওই তো সোজা রাস্তা।’ ওদিকে নিকষ অন্ধকার। শেষ অবধি ফের চালককেই রাজি করিয়ে পৌঁছলাম দুর্গামন্দিরে।

    অনাড়ম্বর একটা পুজো। আলোর তেজ বা মণ্ডপ সজ্জা, কোনওটাই কহতব্য নয়। শুধু মাইকটারই প্রবল তেজ। পুরুলিয়া, মানভূম অঞ্চলে আঞ্চলিক কিছু গান, মিউজিক অ্যালবাম বেরোয়। যেগুলির বেশিরভাগই আদিরসের দিকে ঝোঁকা। সেরকমই কিছু একটা বাজছিল। গুটিকয় ছেলেছোকরা আমড়াবোমা ফাটাচ্ছিল। আর গুটিকয় লোক তাঁদের পাড়ায় রাতের অতিথিদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ নিরীক্ষণের পরে একজন জানতে চাইলেন, ‘কোথা থেকে আসা হচ্ছে?’ তারপর এখানে কেন? কোথায়? ইত্যাদি ইত্যাদি।

    বেশ কিছুদিন হল এখানে নাগা রাইফেলস-এর একটা ক্যাম্প বসেছে। নানা গল্পগাছা শুনেছিলাম। নাগারা আসতে নাকি এলাকার কুকুর কমে গিয়েছে? আলাপি ব্যক্তিটি বললেন, ‘না, না। ওরা একটু কমবয়সি কুকুর পছন্দ করে। মানে চার-পাঁচ কিলো হবে, এরকম।’ তারপর গড়গড় করে নাগা জওয়ানদের গল্প বলতে লাগলেন। নাগারা নাকি মাঝে মাঝে কৌটো হাতে নিয়ে জঙ্গলে ঢোকে। পোকা ধরতে। খাদ্যগুণে সেগুলো নাকি এক-শিশি দামি হেল্‌থ্‌ ড্রিঙ্কের সমান! তারপরই তাঁর সহজ-সরল স্বীকারোক্তি, ‘আমরা কী জংলি! আমাদের থেকে তিনগুণ জংলি ওরা।’ 

    এর মধ্যে হোম স্টে’র মালিক এসে হাজির। গিয়ে উঠলাম তাঁর দোতলা বাড়ির একটি ঘরে। চানটান করে তাজা হলাম। এল রাতের খাবার। রুটি, আলুর তরকারি আর রেডিমেড বোঁদে। তাড়াহুড়োয় বোঁদে বেশি রসসিক্ত হয়নি।

    ইন্দ্র বলল, ‘লোকগুলোকে দেখলে? পুজোতেও কেউ নতুন জামাকাপড় পরেনি।’

    পরদিন ঘুম ভাঙল শুভর বিস্মিত আলতো চিত্‌কারে। ধড়মড়িয়ে উঠে গেলাম। বারান্দার গ্রিলের বাইরেই আস্ত পাহাড়। যেন মখমলি সবুজের তাঁবু। রাতের অন্ধকারে বোঝা যায়নি।

    চায়ের কিছুক্ষণ পরেই জলখাবার এল। আটার লুচি, সেই আলুর তরকারি আর সেই বোঁদে। খাবার পরিবেশন করছেন স্বয়ং মালিক। ওঁর কাছ থেকে এলাকার হাল-হকিকত জানার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তেমন জুত হল না। ভদ্রলোক অত্যন্ত অমায়িক। সব কথাতেই হাসেন। এই যেমন বললেন, এখানকার পঞ্চায়েতে দল ভাঙাভাঙির খেলা চলছে। হাসি। গত সপ্তাহেই এখানে হাতি একজনকে মেরে ফেলেছে। হাসি। আমরা মুচকি হেসে বেরিয়ে পড়লাম।

    আগের রাতেই একটা গাড়ির সঙ্গে রফা হয়েছিল। সেটাই আজ আমাদের বাহন। পাড়াটা ছাড়িয়ে সবেমাত্র গাড়িটা প্রবল গোঁ গোঁ শব্দে একটা চড়াইয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল। রাস্তার ডানপাশে চোখ গেল। খাড়াই পথের অনেকটা নিচে একটা জলধারা। জঙ্গলের ভিতরে কোনও লুকনো উত্‌স থেকে বেরিয়ে বড় বড় পাথরের চাঁইয়ের ওপর দিয়ে গড়িয়ে চলেছে। ওই জলধারার নাম সহজঝোরা। যার জল আটকে মুরগুমা বাঁধ। বিপুল শান্ত জলরাশি। তার শরীরের নানা বিভঙ্গে প্রাকৃতিক কারুকাজ। কখনও সেটা সবুজের দ্বীপ। কখনও বিশাল পাথরখণ্ড। আকাশে শারদ-মেঘ। সত্যেন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘নীলের বিথার, নীলের পাথার’। আকাশের নীল মিশেছে জলে। দূরে হালকা কুয়াশার স্বচ্ছ চাদর। সেই চাদরের ওপারে পাহাড়ের সারি। তারই দিকে যেতে যেতে সহজঝোরা বাঁক নিয়েছে।

    আমরা এগোলাম উত্‌সের দিকে। সেখানে জঙ্গল আরও ঘন। ইন্দ্র তখন অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় পাগল। ভারী শরীরেই লাফ দিয়ে এগোচ্ছিল। হঠাত্‌ লাফে পা পড়ল ভিজে পাথরে। মারাত্মক দুর্ঘটনা এড়াল, নির্ঘাত্‌ বেগুনকোদরের ভৌতিক আশীর্বাদে।

    গাড়ি আবার ঢাল বেয়ে উঠতে শুরু করল। পথে পড়ল হাতি চলাচলের রাস্তা। এখানেই গত সপ্তাহে একজনকে মেরেছে হাতিরা। রাস্তাটা পাক খেতে খেতে আরও উঁচুর দিকে উঠেছে। ওই উঁচু থেকে মুরগুমার জলাশয় আর তার চারপাশের অনেকটা এলাকা দেখা যাচ্ছে। গাড়ি থামালাম। জলাশয় তোলপাড় করে একজন সাঁতার কাটছে, জলাশয়ের পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা লাল মাটির রাস্তা, আরও দূরে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা পাড়ার ঘরবাড়িগুলো স্পষ্ট বা গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। প্রকৃতির আঁকা ল্যান্ডস্কেপ।

    অতি সাধারণ এঁদের জীবনযাপন। উপকরণের বাহুল্য নেই। অযোধ্যা যাওয়ার পথে চোখে পড়েছে জঙ্গল থেকে জ্বালানি জোগাড় করে মাথায়-সাইকেলে ডালপালা নিয়ে ফেরা বাচ্চা, মহিলা-পুরুষ। দেখেছি, আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা পাথর দিয়ে নতুন বাড়ির ভিত গাঁথছে যুবক। দেখেছি, আদুড় গায়ে বা ছেঁড়া জামা পরে কাচ্চাবাচ্চারা সরকারি কল ঘিরে খেলায় মত্ত।

    কাছ থেকে দেখলাম জলাশয়, ঘরবাড়ি, মানুষজন, বাচ্চাদের খেলা আর নাগা ক্যাম্প। তাপস, আমাদের গাড়ি-চালক, দেখালেন বনবিভাগের একটা পরিত্যক্ত বাংলো। অশান্ত সময়ে বাংলোটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন আর কোনও ঝামেলা নেই। নাগা জওয়ানেরা ঘাঁটি গেড়ে আছে। তারাই কেবল চোলাই খেয়ে মাঝেমধ্যে হুজ্জোত করে। দোকানে মাল কিনে দাম দিতে চায় না। আর কোনও সমস্যা নেই।

    মুরগুমায় সমস্যা মানায় না।

You may like