Home >> Story >> নাটক

শিল্পসংস্কৃতি

নাটক

সুব্রত ঘোষ

  • গভীর আত্মবিশ্লেষণের নাটক

    শুধুই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ও গণতন্ত্রের পক্ষে স্পর্ধিত প্রতিবাদী চিত্‌কার নয়, এ নাটক সমসময়ের মূল্যায়ন।

    এই সময়ের নিরিখে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং প্রাসঙ্গিক এক প্রযোজনা নিয়ে এল সংস্তব। মধুসূদন মঞ্চে ভাসলভ হাভেল অনুপ্রাণিত চন্দন সেনের নাটক ‘স্পর্ধাবর্ণ’ দেখতে দেখতে মনে হল এই নাটক শুধুই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ও গণতন্ত্রর পক্ষে স্পর্ধিত প্রতিবাদী চিত্‌কার নয়, এই নাটক ‘চৈতন্যে মড়কলাগা’দের এক গভীর আত্মবিশ্লেষণ যা সাম্প্রতিক সময়ের মূল্যায়নে পথ দেখাবে ইতিহাসকে। চেকোশ্লোভাকিয়ার শেষ রাষ্ট্রপ্রধান আর চেক প্রজাতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি, গাঁধী শান্তি পুরস্কার প্রাপক হাভেল ছিলেন একাধারে কবি, দার্শনিক, সাহিত্যিক, ও অবশ্যই থিয়েটার অফ দ্য অ্যাবসার্ড-এর এক একনিষ্ঠ প্রবক্তা। তাঁর নাটকে আমরা পাই পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন মানুষের দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা ও পরিণতি যা মোটামুটি আলবেয়র কামু-র ‘দ্য মিথ অফ সিসিফাস’-এর বর্ণিত পথ ধরেই এগোয় এবং এই ধারার নাটকের মতো তাঁর নাটকেও থাকে এক মেটাফিজিকাল মানসিক যন্ত্রণা বা অ্যাঙ্গুইশ যা দর্শকের কাছে কোনও কোনও সময়ে হয়ে পড়ে অসহনীয়। এই ধারার নাটকের যে বৈশিষ্ট্যটি তাকে অন্য ধরনের প্রতিবাদী নাটকের থেকে আলাদা করে দিয়েছে তা হল মূল ধারণাগুলিই নাটকের গঠন এবং বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে সব রকমের নাট্য-লজিক অথবা এক ধারণার সঙ্গে অন্য ধারণার যে-যোগসূত্র সাধারণত থাকে তা এই ধরনের নাটকে সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত।

    চন্দনের এই নাটকে হাভেলের বিখ্যাত ভ্যানেক নাটকের একটি, ‘প্রোটেস্ট’ এবং তাঁর প্রথম নাটক ‘দ্য গার্ডেন পার্টি’র আভাস পাওয়া গেলেও নাটককার অ্যাবসার্ড ধারার ফর্মটিকে সচেতনভাবেই পুরোপুরি রাখেননি কারণ তাতে দর্শকের কাছে পৌঁছতে কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়তে হত। হয়তো এই বিড়ম্বনার কারণেই দশ-বারো বছরের মধ্যে, ষাটের দশকের গোড়াতেই এই ধারার নাটক লেখা থেমে গিয়েছিল। অবশ্য তার প্রভাব আজও দেখা যায়। এই ধারার নাটকের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী দু’টি মূল চরিত্রকে ধরে নাটককার দর্শকের কাছে পৌঁছিয়ে যান। চন্দন সেন তাঁর নাটকে সংলাপ রচনায় এক বিশেষ ধারা তৈরি করে নিয়েছেন, কিন্তু এই নাটকে তিনি সংলাপ রচনাকে যে স্তরে নিয়ে গিয়েছেন তা বিশেষভাবে উল্লেখনীয়। অ্যাবসার্ড নাটকের বৈশিষ্ট্য মেনে তিনি অর্থহীন বা ননসেন্স ভাষা ব্যবহার করেননি, উল্টে প্রতিটি শব্দের ভার নিক্তিতে মেপে তিনি সংলাপে তা প্রয়োগ করেছেন, ফলে একটুকরো বাড়তি শব্দ ব্যবহৃত হয়নি। শব্দচয়নে তাঁর মিতব্যয়িতা দর্শককে মুগ্ধ করে।

    নাট্যপ্রযোজনার ক্ষেত্রে সংস্তব নাট্যদলটি তাঁদের সুনাম বজায় রেখেছেন নিঃসন্দেহে। দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশনা অত্যন্ত সুবিন্যস্ত। প্রথমেই যে বিষয়টি নজর কাড়ে তা হল সৌমিক-পিয়ালীর মঞ্চ। পর্দা ওঠার পর অনেকটা সময় কোনও সংলাপ থাকে না এবং একটি চরিত্র-এ ক্ষেত্রে নির্দেশক-অভিনেতা দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়- একাই কোনও একজনের জন্য অপেক্ষায় থাকেন। এই দীর্ঘ সময় মঞ্চকে যেমন সজীব রাখে দ্বিজেনের ধীর চলন, তেমনই একই সঙ্গে বাবুল মিস্ত্রী নির্মিত সৌমিক-পিয়ালীর মঞ্চ ও বাদল দাসের আলো। পঞ্চানন দে তাঁর সুনাম বজায় রেখেছেন রূপসজ্জার কাজে, বিশেষ করে স্বদেশ চরিত্রটিতে। গৌতম ঘোষের আবহ যথাযথ নাট্যচলনে সাহায্য করেছে। অভিনয়ে দ্বিজেন স্বদেশ চরিত্রটিকে তার সঠিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। চরিত্রটির মানসিক দ্বন্দ্ব, নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই, এবং নিজের কাছে নিজের হেরে যাওয়া ফুটে উঠেছে তাঁর কাজে। শারীরিক অভিনয়ের ক্ষেত্র এটি নয় কিন্তু দেখা গেল বাচিক অভিনয়ের এক অসাধারণ কাজ। সংলাপ উচ্চারণেও নিক্তিতে মেপে স্বর প্রয়োগ করা হয়েছে, অভিব্যক্তি প্রকাশে ব্যবহার হয়েছে হাতের চলন, চোখ এবং মুখমণ্ডল। বিপ্রতীপ অবস্থানে নয়ন চরিত্রটিকেও পার্থসারথি সেনগুপ্ত সমমর্যাদা দান করেছেন ফলে দর্শকের কাছে দ্বন্দ প্রকাশে কোনও বাধা সৃষ্টি হয় না। অত্যন্ত সাবলীল রাজু মণ্ডলের ভন্টাই। ভাল লাগে সুনীল মুখার্জির কে  কে আর এবং পৃথা গোস্বামীর পুরমাতা।

You may like